জনশক্তি রফতানি বাড়ল তিনগুণ, রেমিট্যান্স গেল কোথায়?

সোমবার, নভেম্বর ৭, ২০২২

ঢাকা : ডলার সংকটে দেশে একরকম হাহাকার চলছে। রিজার্ভ কমতে কমতে তলানীতে ঠেকছে। আমদানি ব্যয় মেটানোর মতো ডলারও জুটছে না সহজে। অনেক ব্যাংকই এখন নতুন এলসি খুলতে পারছে না। এই যখন অবস্থা তখন দেশ থেকে জনশক্তি রফতনি বাড়লেও রেমিট্যান্স না বেড়ে উল্টো কমে যাচ্ছে।

যে হারে বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রফতানি হচ্ছে সে হারে রেমিট্যান্স এলে রিজার্ভে এত সংকট তৈরি হতো না। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, প্রবাসীরা এখন বৈধপথে রেমিট্যান্স পাঠানো কমিয়ে দিয়ে অবৈধপথে বা হুন্ডির মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠানোর দিকে ঝুঁকে পড়ছেন। এ জন্য বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রফতানি বাড়লেও রেমিট্যান্স না বেড়ে কমে যাচ্ছে।

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য মতে, গত বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর-এই ৯ মাসের চেয়ে চলতি বছরের ৯ মাসে বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রফতানি প্রায় তিনগুণ বেড়েছে। সে হিসাব অনুযায়ী রেমিট্যান্সও তিনগুণ বৃদ্ধি পাওয়ার কথা। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে রেমিট্যান্স না বেড়ে উল্টো কমে গেছে।

এর পেছনের কারণে সম্পর্কে বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘প্রথমত, প্রবাসীদের রেমিট্যান্স পাঠাতে গিয়ে অনেক বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। দেখা যাচ্ছে হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠাতে গেলে কোনো প্রবাসী বসে থেকে সঙ্গে সঙ্গেই দেশে টাকা পাঠাতে পারছেন। অথচ একই ব্যক্তি যদি সোনালী ব্যাংকের সৌদি শাখা বা অন্য কোনো দেশের অন্য কোনো ব্যাংকের ব্রাঞ্চে বসে টাকা পাঠান সে টাকা দেশে থাকা আত্মীয়-স্বজনের হাতে পেতে সময় লেগে যায় পাঁচ দিন থেকে এক সপ্তাহ। শুধু তাই নয়, এর বাইরেও নানারকম বিড়ম্বনায় পড়তে হয় প্রবাসীদের।

এ কারণে এমন অনেক প্রবাসী আছেন দেশে অর্থ কম পাঠিয়ে সে দেশেই রেখে দিচ্ছেন বা অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করছেন। এ কারণে দেশ থেকে জনশক্তি রফতানি বাড়লেও রেমিট্যান্স বাড়ছে না। অবৈধ পথে আসছে বেশি। এর ফলে রেমিট্যান্সের কারণে যে পরিমাণে রিজার্ভ বৃদ্ধি পাওয়ার কথা সেটি হচ্ছে না।’

বিএমইটির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর এই ৯ মাসে বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রফতানি হয়েছিল তিন লাখ ১৭ হাজার ৭৯৯ জন। আর চলতি বছরের ৯ মাসে বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রফতানি হয়েছে আট লাখ ৭৪ হাজার ৭৩৯ জন। অর্থাৎ গত বছরের ৯ মাসের চেয়ে চলতি বছরের ৯ মাসে বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রফতানি বেশি হয়েছে পাঁচ লাখ ৫৬ হাজার ৯৪০ জন।

মাসভিত্তিক পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গত বছরের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রফতানি হয় ৩৫ হাজার ৭৩২ জন, আর চলতি বছরের রজানুয়ারিতে রফতানি হয় এক লাখ ৯ হাজার ৬৯৮ জন। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে জনশক্তি রফতানি হয় ৪৯ হাজার ৫১০ টাকা, এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে হয় ৯২ হাজার ৫৬৯ জন। গত বছরের মার্চ মাসে জনশক্তি রফতানি হয় ৬১ হাজার ৬৫৩ জন, এ বছরের মার্চ মাসে রফতানি হয় এক লাখ ২০ হাজার ৩১৬ জন। গত বছরের এপ্রিল মাসে জনশক্তি রফতানি হয়, ৩৪ হাজার ১৪৫ জন, এ বছর হয়েছে এক লাখ তিন হাজার ৯৭৫ জন।

গত বছরের মে মাসে জনশক্তি রফতানি হয় ১৪ হাজার ২০০ জন, এবার হয়েছে ৭৭ হাজার ৪২১ জন। গত বছরের জুন মাসে জনশক্তি রফতানি হয়, ৪৮ হাজার ৫৬৭ জন, এবার হয়েছে এক লাখ ১১ হাজার ৫৩৯ জন। গত বছরের জুলাই মাসে জনশক্তি রফতানি হয়, ১২ হাজার ৩৮০ জন, এবার হয়েছে ৭৫ হাজার ৪৯৯ জন। গত বছরের আগস্ট মাসে জনশক্তি রফতানি হয় ১৯ হাজার ৬০৪ জন, এবার গেছে ৯২ হাজার ৯০৮ জন।

আর গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রফতানি হয় ৪২ হাজার আটজন, এবার হয়েছে ৯০ হাজার ৮১৪ জন। সুতরাং গত বছরের চেয়ে এ বছর প্রতি মাসেই বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রফতানি বেড়েছে দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ।

জনশক্তি রফতানির তুলনায় রেমিট্যান্স আসার চিত্রটি সম্পূর্ণ বিপরীত। গত বছরের ৯ মাসে তিন লাখ ১৭ হাজার ৭৯৯ জন বাংলাদেশ থেকে বিদেশে গেলেও রেমিট্যান্স এসেছিল ১৭ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার। টাকার অঙ্কে যা দাঁড়ায় এক লাখ ৭৭ হাজার ৫৮৪ কোটি ৯৭ লাখ টাকা (১ ডলার=১০৩ টাকা ধরে)। অথচ চলতি বছরের ৯ মাসে বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি আট লাখ ৭৪ হাজার ৭৩৯ জন গেলেও রেমিট্যান্স না বেড়ে উল্টো কমে গেছে।

বিএমইটির তথ্য বলছে চলতি বছরের ৯ মাসে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স এসেছে ১৬ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলারের। টাকার অঙ্কে যা দাঁড়ায় এক লাখ ৬৯ হাজার ৫৯৪ কোটি ১৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ গত বছরের চেয়ে এ বছরের ৯ মাসে বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রফতানি পাঁচ লাখ ৫৬ হাজার ৯৪০ জন বাড়লেও রেমিট্যান্স কমেছে সাত হাজার ৯৯০ কোটি ৮৪ লাখ টাকা।