পিঠা বিক্রি করেই তিন মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন জমিলা

বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ২৪, ২০২২

ঠাকুরগাঁও: সাধারণত শীত এলেই সামনে আসে পিঠাপুলির কথা। এক সময় বাড়িতে বাড়িতে চলতো পিঠা বানানোর উৎসব। কিন্তু গ্রাম বাংলার চিরচারিত ওই রীতি এখন তেমন একটা চোখে পড়ে না। তারপরও শীতের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পিঠা বানানোর অনুষঙ্গ কিন্তু থেমে নেই এখনো। শহর বা গ্রামের অলিগলিতে জমে ওঠে মৌসুমি পিঠার দোকান। সেখানে পাওয়া যায় হরেক রকমের পিঠা। এই পিঠা কারো বাড়তি আয়ের উৎস, আবার কারো বা জীবিকার প্রধান মাধ্যম।

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার মোহন ইক্ষু ফার্মে তেমনই একটি পিঠার দোকান ষাটোর্ধ্ব জমিলা বেগমের। মাটির চুলায় ভাপা ও চিতই পিঠা তৈরি করে ক্রেতার অপেক্ষায় বসে থাকেন তিনি। প্রতিদিন সূর্য উঠার আগে থেকেই খেজুরের রস খেতে আসার মানুষদের ভিড় বাড়তে থাকে। তাই জমিলা বেগম প্রতিদিন ফজের সময় তথা মানুষের ভিড় জমবার আগেই তিনি এসে মাটির চুলায় আগুন জ্বালিয়ে পিঠা বিক্রির প্রস্তুতি নিতে থাকেন, সকাল ৬টা থেকে ৮ টা পর্যন্ত এখানে আসন পাতেন তিনি। পিঠা বিক্রি করে শীতের আনন্দে খেজুরের রস খেতে আসা দর্শনার্থীদের মধ্যে পিঠাপ্রেমিদের মনের খোরাক মেটান জমিলা বেগম।

বৃহস্পতিবার (২৪ নভেম্বর) ভোর রাতে খেজুর বাগানে কথা হয় জমিলা বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমার বাড়ি মোহন ইক্ষু ফার্ম এলাকায়। প্রায় ১০ বছর আগে স্বামী মারা গেছেন। জীবিকার তাগিদে তাই শীতকালে পিঠা বিক্রি করে আর গরমকালে অন্যের বাড়িতে কাজ করে কোনো মতে জীবন চালাই।’

তিনি আরও বলেন, ‘শীতকালে প্রচুর মানুষ খেজুরের রস খেতে আসেন তাদের মধ্যে কিছু অংশ লোক পিঠা খেয়ে যান। অনেকে পরিবারের জন্যও পিঠা কিনে নিয়ে যান। প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ টাকার পিঠা বিক্রি করে লাভ হয় ৫০ থেকে ৬০ টাকা। ভাপা ও চিতই পিঠা বিক্রি করি। সঙ্গে থাকে গুড় ও বিভিন্ন চাটনি। দেড় থেকে দুই কেজি চালের পিঠা তৈরি করে, তা বিক্রি করি ১০ টাকা পিস।’

বৃদ্ধা জমিলা বেগম বলেন, ‘স্বামী মারা যাওয়ার পর আমার তিন মেয়ে নিয়ে থাকতাম। অনেক কষ্টে পিঠা বিক্রি করে মেয়েদের বিয়ে দিয়েছি। মাথা গোজার ঠাঁই নেই। কোনো রকম থেকে খেকে কোনো মতে জীবন কাটাচ্ছি। ঘরে না খেয়ে থাকলেও দেখার কেউ নাই। তাই বাধ্য হয়েই রাস্তায় খেজুরের বাগানে দোকান নিয়ে বসেছি।’

জমিলা বেগমের কাছ থেকে জানা যায়, তার বিধবা ভাতার কার্ড রয়েছে, তবে ভূমিহীন হিসেবে এখনও সরকারি ঘর বরাদ্দ পাননি। দুই বছর আগে একটি ঘরের আশায় চেয়ারম্যানদের কাছে কাগজপত্র জমা দিয়েও কোনো লাভ হয়নি। হয়তো একটি সরকারি ঘর পেলে নিঃসঙ্গ জীবনে একটু স্বস্তি পেতেন ষাটোর্ধ্ব এই বৃদ্ধা।

দূরামাড়ী থেকে আগত কয়েকজনের মধ্যে কথা হয় মোস্তাফিজুর রহমানের সাথে। তিনি বলেন, ‘গতবারও এই সময়ে এসেছিলাম ওই বৃদ্ধা নারীকে শীতকালে এখানে পিঠা বিক্রি করতে দেখছি। সরকার যদি এই অসহায় মানুষটির পাশে কেউ দাঁড়াত বা একটি ঘর দিত তাহলে তার অনেক উপকার হতো।’