অংশগ্রহণমূলক নয়, প্রয়োজন প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন

বুধবার, অক্টোবর ৫, ২০২২

বদিউল আলম মজুমদার
আমরা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চাই না। আমরা চাই প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন। ২০১৮ সালে আমাদের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হয়েছিল। সবাই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিল। সেটি কি সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছিল? আমি ঠিক জানি না, উনারা ইচ্ছাকৃতভাবে বলেন নাকি অনিচ্ছাকৃতভাবে বলেন, কিন্তু এই ভাবনাটিই সঠিক না।

আমরা চাই সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন। এ জন্য প্রথমত প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের লক্ষ্যে আমাদের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন হতে হলে প্রথমে সবার জন্য সময় সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।

সবাই যেন নিজ দলের পক্ষে প্রচার পচারণা চালাতে পারে, নির্বাচনী কর্মকাণ্ড চালাতে পারে সেটি নিশ্চিত করতে হবে। এবারও বিভিন্ন বাধা বিপত্তি তৈরি হচ্ছে। গতবারও নির্বাচনের আগে মামলা হামলাসহ অনেক কিছু হয়েছে। আমাদের সংবিধানকে অস্ত্রে পরিনত করা হয়েছে। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত এগারোটি নির্বাচন হয়েছে।

কয়েকটি তত্বাবধায়ক সরকারের আমলে হয়েছে। এগুলো গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। দুটি নির্বাচন এক তরফা হয়েছে যেগুলো কোনো নির্বাচন ছিল না। নির্বাচনে যদি প্রতিযোগিতা না থাকে, অংশগ্রহণই না থাকে, তাহলে সেটিতো আর নির্বাচন হলো না। দলীয় সরকারের অধীনে যতগুলো নির্বাচন হয়েছে সবগুলোই ‘ফেইলড ইলেকশন’।

আমাদের সংবিধানকে একতরফাভাবে পরিণত করে, নিজেদের মতো পরিবর্তন করে যেটি করা হচ্ছে, আমরা আরেকটি ব্যর্থ নির্বাচনের দিকে ধাবিত হচ্ছি। কাজেই এ থেকে পরিত্রাণের জন্য আমাদের একটি সাংবিধানিক কাঠামো দিতে হবে। সাংবিধানিক কাঠামোর মাধ্যমেই কিন্তু প্রশাসনিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা যাবে। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো, আমাদের নির্বাচন কমিশনকে নিরপেক্ষ হতে হবে।

গতবার আমরা দেখেছি যে, নির্বাচন কমিশনের প্রচ্ছন্ন সম্মতিতে যে ক্ষমতাশীল দল, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, তারা মধ্যরাতে ভোটগ্রহণের অনুষ্ঠান করেছে। কাজেই নির্বাচন কমিশনকে নিরপেক্ষ হতে হবে। তাহলে হয়তো নিরপেক্ষও সুষ্ঠু নির্বাচনের সম্ভাবনা আশা করতে পারি। স্বচ্ছতার জায়গাটি নিশ্চিত না হলে, আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি যারা আছেন তারাই পুনরায় ফিরে আসবেন।

ইভিএম নিয়ে যে একটি অযৌক্তিক অর্থাৎ কারসাজিমূলক একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, এটি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আমি বলব ইভিএম একটি যন্ত্র এবং নিম্নমানের একটি যন্ত্র, যেটি দিয়ে ভোট গণনা করা যেমন যায় তেমনি ভোট জালিয়াতিও করা যায়। ভোট কারচুপির মাধ্যমে এই জালিয়াতিটুকু করতে পারে নির্বাচন কমিশন এবং তার কর্মকর্তারা। আমি মনে করি, যদি সত্যিকার অর্থেই নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে হয় তাহলে ইভিএম থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এটি কোনো সমাধান হতে পারে না।

আমাদের এই ভোট কারচুপির নীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ইভিএম থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এখানে আরও অনেক দুর্বল পয়েন্ট আছে যা ইতিমধ্যে প্রমাণিত।

সরকার তত্বাবধায়ক সরকারের অধীন নির্বাচন প্রক্রিয়াটিও বাতিল করে দিয়েছে। এর কারণ কী? কারণ, তারা জিততে চায়। কাজেই সেটি যদি পরিবর্তন করা না হয় তাহলে সমস্যা হতে পারে। যে কারণে ১০ মে এক পৃষ্ঠার সংক্ষিপ্ত আদেশে আদালত তত্বাবধায়ক সরকারকে ভবিষ্যতের জন্য অবৈধ ঘোষণা করা হলো বলে আদেশ দিয়েছিলেন।

আমার কথা, নির্বাচন যদি সুষ্ঠু না হয়, গ্রহণযোগ্য না হয় এবং নির্বাচনের মাধ্যমে যদি মানুষের সম্মতির শাসন প্রতিষ্ঠিত না হয়, তাহলে জাতি আগামীতে আরও সংকীর্ণ, আরও বেশি অন্ধকারচ্ছান্ন হয়ে পড়বে। যার ফলে দেশ অবধারিতভাবেই একটি মৌলবাদী রাষ্ট্রে পরিণত হবে। সম্মিলিতভাবে ভালো থাকতে হলে গঠনমূলক দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তাভাবনার মাধ্যমে এগোতে হবে।

লেখক: সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)