রাজনৈতিক দলগুলোকে এক টেবিলে বসাতে চায় পশ্চিমারা

বুধবার, নভেম্বর ১৬, ২০২২

ঢাকা: চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ অন্য দলগুলোর মধ্যে সংলাপ চায় পশ্চিমা দেশগুলো। একইসঙ্গে সংবিধানের আলোকে সমাধান খুঁজতে সরকার ও বিরোধী দলকে এ ব্যাপারে তাগাদা দেওয়া হচ্ছে প্রভাবশালী দেশের কূটনীতিকদের পক্ষ থেকে। তারা সম্প্রতি আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ের বৈঠকে এমন মনোভাবের কথা প্রকাশ করেছেন বলে জানা গেছে।

কূটনীতিকরা মনে করেন, আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচনকালীন সরকার কেমন হবে এ নিয়ে দ্রুত দ্বিধা-দ্বন্দ্বের অবসান জরুরি। মূলত প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নির্বাচনকালীন সরকার ইস্যুতে দুই মেরুতে অবস্থান করছে। ক্ষমতাসীনরা চায় রাজনৈতিক সরকারের অধীনে নির্বাচন। আর বিএনপি বলছে, নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচন নয়। চলমান এ টানাপোড়েনের মধ্যে কূটনীতিকরা তৎপর হয়ে উঠেছেন।

আইন অনুযায়ী ২০২৪ সালের ২৯ জানুয়ারির মধ্যে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হতে হবে। দিন যতই ঘনিয়ে আসছে এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ বাড়ছে। ভোট গ্রহণের ক্ষেত্রে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহারের বিষয়ে চূড়ান্ত ফয়সালা না হলেও বিরোধী দলগুলোর মূল নজর নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার নিয়ে। এ নিয়ে ধারাবাহিক আন্দোলনে মাঠে বিএনপি। সমমনা দলগুলো যুগপৎ আন্দোলনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।

তাহলে এ সংকটের সমাধান কোথায়? বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাসহ সমাজ বিশ্লেষকরাও বলছেন, ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে একটি অর্থবহ সংলাপ আয়োজনই চলমান সংকট নিরসনের একমাত্র পথ। অন্যথায় রাজনীতি ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। এতে সুযোগ নিতে পারে তৃতীয় কোনো পক্ষ। যা কারও জন্য সুখকর হবে না। এদিকে রাজনৈতিক সংকট নিরসনে পশ্চিমা কূটনীতিকদের সংলাপে বসার পরামর্শকে অনেক রাজনৈতিক দলের নেতারা ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখেন।

রাজনৈতিক দলগুলোকে সংলাপে আনতে ঢাকায় নিযুক্ত বিদেশি কূটনীতিকদের তৎপরতা লক্ষণীয়। বিশেষ করে মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাসসহ পশ্চিমা দেশগুলোর কূটনীতিকরা এ ব্যাপারে বেশি এগিয়ে। সম্প্রতি ঢাকা সফরে আসা বাইডেন প্রশাসনের প্রভাবশালী রাজনীতিক ও কর্মকর্তারাও সুষ্ঠু নির্বাচনের তাগাদা দিয়েছেন।

আ.লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

সবশেষ যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক উপসহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী আফরিন আক্তার ঢাকা সফরে জানিয়ে গেছেন, তার সরকার কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষে নয়। তারা অবাধ, সুষ্ঠু, স্বচ্ছ, অংশগ্রহণমূলক, গ্রহণযোগ্য এবং আন্তর্জাতিক মানের নির্বাচন দেখতে চান।

এর বাইরে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা ও জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ইতোমধ্যে বৈঠক করেছেন পশ্চিমা প্রভাবশালী দেশের রাষ্ট্রদূতসহ সেসব দেশের প্রতিনিধিরা। গত সপ্তাহে ঢাকায় নিযুক্ত নরওয়ের রাষ্ট্রদূত এসপেন রিকটার ভেন্ডসেন ও সুইডিশ রাষ্ট্রদূত অ্যালেক্স বার্গ ফন লিন্ডে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলটির নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এদিকে ওয়াশিংটন থেকে গত ৭ নভেম্বর সুষ্ঠু নির্বাচনের বার্তা দেন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র নেড প্রাইস।

এ প্রেক্ষাপটে কি ভাবছে ক্ষমতাসীন দল? এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘সংবিধানের আলোকে নির্বাচন হবে, এর বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। তবুও সংলাপ হতে পারে। এ জন্য আওয়ামী লীগের দরজা খোলা। বিএনপি চাইলে সংসদ থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতে এ বিষয় নিয়ে কথা বলতে পারে। সংলাপ করতে হবে, এর বিকল্প নেই। বিএনপি আলোচনা করতে চাইলে আমরা প্রস্তুত।

বিদেশি কূটনীতিক বা অন্য কারও মতো করে সংলাপে যাবে না—বিএনপি একথা জানিয়ে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘নির্বাচনকালীন সরকার কেমন হবে, সে বিষয়ে যদি কোনো আলোচনা হয়, অবশ্যই বিএনপি সব অংশীজনের সঙ্গে বসতে সম্মত।’

একই প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ‘আমরা ২০১৮ সালের মতো আর কোনো রাজনৈতিক সংলাপে যাব না। আমরা সেই সংলাপে যাব, যেটি নির্বাচনকালীন নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার ইস্যুতে হবে।

আ.লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

নির্বাচনকালীন সরকার ইস্যুতে বিরোধী দল জাতীয় পার্টি তাদের ভাবনার কথা প্রকাশ করেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে দলটির চেয়ারম্যান জি এম কাদের বলেন, ‘নির্বাচনকালীন সরকার ইস্যুতে রাজনৈতিক সংকটের সমাধান সরকারের হাতে। বড় দলগুলোর বেশিরভাগই চায় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন। প্রথম কথা হলো সরকার যদি মনে করে সব দলকে নিয়ে নির্বাচন প্রয়োজন, তাহলে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। সংবিধানে পরিবর্তন আনা ছাড়া তো সমাধানের রাস্তা নেই। এ জন্য সংলাপ হতে পারে। সরকার এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিলে আমরা সহযোগিতা করব।

তিনি আরও বলেন, ‘বিএনপি সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে নির্বাচনকালীন সরকারের দাবি পূরণের চেষ্টা করছে। আমরা বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছি। সরকার সবাইকে নিয়ে নির্বাচন করতে সম্মত হলে জাপা দলীয় ফোরামে বসে করণীয় সম্পর্কে মতামত জানাবে। আমাদের অবস্থান হলো সব পক্ষের মতামত নিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা। নির্বাচনকালীন সরকার ইস্যুতে দেশ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার দিকে যাচ্ছে। এই অনিশ্চয়তা কারও জন্য সুখকর হবে না।

গণতন্ত্রে সংলাপের বিকল্প নেই উল্লেখ করে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘নির্বাচনকালীন সরকার কেমন হবে এই ইস্যুতে কেউ যদি তালগাছ আমার; তা ঠিক করে রাখে তাহলে সংলাপ অর্থবহ করা কঠিন। আমরা বিগত কয়েক বছর বেশ কয়েকটি সংলাপ দেখেছি। আওয়ামী লীগের পক্ষে আব্দুল জলিল ও বিএনপির পক্ষে মান্নান ভূঁইয়া সংলাপে নেতৃত্ব দিয়েছেন। কিন্তু কোনো আলোচনাই ফল দেয়নি। তবে দেশের সাধারণ মানুষ কী চায় এ বিষয়টি বড় দলগুলো বিবেচনায় নিলে সমাধানের পথ বের হতে পারে।’

ক্ষমতাসীন দলকে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে বসার আহ্বান জানিয়েছেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘সংলাপ ছাড়া আপনাদের মুক্তি নেই, এ দেশের মানুষেরও মুক্তি নেই। বিএনপির সমাবেশে বাস বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। নেতাকর্মীদের আটক করা হচ্ছে, মামলা দেওয়া হচ্ছে। এগুলো পরিহার করা হোক। সংলাপ এই দেশকে সুশাসনের দিকে নিয়ে যাবে।’

আ.লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

এ বিষয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক হারুন অর রশিদ বলেন, এখন যে পরিস্থিতি তাতে মনে হচ্ছে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ‘পয়েন্ট অব নো রিটার্ন’ পর্যায়ে আছে। এ অবস্থা বেশিদিন থাকবে না। নির্বাচন ঘনিয়ে এলে দলীয় সরকারের অধীনে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে। কারণ দলটি ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় তাদের পছন্দের ব্যক্তিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান বানাতে সংবিধান সংশোধন করেছিল। এখন তাদের মুখে তত্ত্বাবধায়ক সরকার চাওয়া মানায় না।

সংবিধানের আলোকেই নির্বাচন হবে—এটিই একমাত্র রাজনৈতিক সমাধান এ কথা উল্লেখ করে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ সভাপতি হাসানুল ইনু বলেন, বিএনপি নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন চাইলেই তো হবে না। যারা সংবিধানের আলোকে নির্বাচন চায় না, তাদের ক্ষেত্রে সংলাপের কোনো জায়গা নেই।

এই মুহূর্তে দেশে জরুরি কাজের মধ্যে অন্যতম হলো একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করা—এ কথা উল্লেখ করে কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘বাম গণতান্ত্রিক জোট মনে করে দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হতে পারে না। এজন্য আমরা নির্বাচনকালীন একটি নির্দলীয় তদারকি সরকার চাচ্ছি, যে সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠান সফল করতে ইসিকে সহযোগিতা করবে। সেই সরকারের রূপরেখা কী হবে, এ নিয়ে সংলাপ হতে পারে।’

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি সাইফুল হক বলেন, আমরা তো রাজনৈতিক সংকট বা সহিংস অবস্থান চাই না। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে একটি অর্থবহ সংলাপের মধ্য দিয়ে সমস্যা সমাধান হতে পারে।

রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে জানিয়ে গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি বলেন, এই সংকটের জন্য আওয়ামী লীগ দায়ী। তাই ক্ষমতায় থাকা দলকেই সমস্যা সমাধানের পথে যেতে হবে।

আ.লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

গণফোরাম একাংশের সাধারণ সম্পাদক সুব্রত চৌধুরী বলেন, আওয়ামী লীগ সংবিধানের দোহাই দিয়ে নির্বাচন করতে চাইলে চলমান রাজনৈতিক সংকটের সমাধান নেই। আর বিরোধী দলগুলো নিরপেক্ষ সরকারের কথা বলে কঠোর অবস্থান নিয়ে থাকলেও সংকট থেকেই যাবে। তাই উভয়পক্ষ মিলে যদি অর্থবহ সংলাপের মধ্য দিয়ে সমস্যা সমাধানের দিকে যাওয়া যায় তাহলে আগামী পাঁচ বছর বাংলাদেশ নিরাপদ থাকবে।

অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পক্ষে অবস্থান সাবেক রাষ্ট্রপতি ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন দল বিকল্পধারার। রাজনৈতিক সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার বিষয়ে স্পষ্ট জানিয়েছেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি সভাপতি আ সম আবদুর রব। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ চাইলেই কেবল নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে সৃষ্ট রাজনৈতিক জটিলতার সমাধান হতে পারে।

নির্বাচনকালীন সরকার ইস্যুতে চলমান রাজনৈতিক টানাপোড়েন আমরা কেন সমাধান করতে পারব না এমন প্রশ্ন রেখে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের যুগ্ম সম্পাদক ইকবাল সিদ্দকী বলেন, সংলাপই সমস্যা সমাধানের পথ খুলে দিতে পারে। আওয়ামী লীগ দেশ পরিচালনার ড্রাইভিং সিটে আছে। তাই তাদের সংলাপের জন্য উদ্যোগী হতে হবে।

আওয়ামী লীগের যদি জনগণের ভাষা বোঝার ক্ষমতা থাকে তাহলে অনতিবিলম্বে পদত্যাগ করে সংসদ ভেঙে দিয়ে মধ্যবর্তী সরকার অথবা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে এমন মতামত তুলে ধরে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) সভাপতি অলি আহমেদ বলেন, ‘নানা কারণে দেশের মানুষ অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

আগামী মাসে কী হবে কেউ বলতে পারছে না। আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক সংকট সমাধানে সবাইকে ডাকবে এমন আলামত নেই। বিএনপি সমমনা দলগুলোর সঙ্গে বৈঠকে আন্দোলনের এজেন্ডা চূড়ান্ত করেছে। নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন আদায়ে আমরা মাঠে নামব।কা:বে: