করোনাকালে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের কোয়ারেন্টাইন: হোটেলে রুম ৫৩, বিল হয়েছে ৭৮টির

Tuesday, November 29th, 2022

ঢাকা : রাজধানীর তোপখানা রোডের এশিয়া হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টে ভাড়া দেওয়ার মতো কক্ষ আছে ৫৩টি। করোনাকালে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের কোয়ারেন্টাইনের জন্য এর ৪৫টি কক্ষ ভাড়া নেয় মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। কিন্তু কাগজে-কলমে প্রতিদিন ভাড়া দেওয়া হয়েছে ৭৮টি কক্ষের। এ ছাড়া কোয়ারেন্টাইনে থাকা কর্মীদের খাবার, যন্ত্রপাতি ও ওষুধ কেনায় অতিরিক্ত ব্যয় দেখিয়েও আত্মসাৎ করা হয়েছে সরকারি টাকা। করোনাকালে ঢাকার চারটি সরকারি হাসপাতালের ব্যয় নিয়ে স্বাস্থ্য অডিট অধিদপ্তরের নিরীক্ষায় এসব অনিয়ম বেরিয়ে এসেছে।

কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী, মুগদা মেডিকেল কলেজ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ এবং কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে মোট ৩০ কোটি টাকার অনিয়ম পাওয়া গেছে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনটি এরই মধ্যে রাষ্ট্রপতির দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে করোনা সংক্রমণ শুরুর পর হাসপাতালে দায়িত্বপালনকারী চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের বিভিন্ন হোটেলে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়। এজন্য ঢাকায় ২০টি হোটেল ঠিক করে সরকার। তখনই হোটেল ভাড়া ও খাবার বিলের নামে অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়টি আলোচনায় আসে।

পরে ঢাকার ১৫টি হাসপাতালের ব্যয়ের ওপর নিরীক্ষা চালায় সরকারের স্বাস্থ্য অডিট অধিদপ্তর। এতে কয়েকটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মাধ্যমে ২৯ কোটি ৯৩ লাখ ৬৮ হাজার ৯৬৯ টাকা আত্মসাতের তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়। এসব অর্থ লোপাটের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ও লোপাট করা অর্থ আদায়ের সুপারিশ তুলে ধরা হয় নিরীক্ষা প্রতিবেদনে।

কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল : প্রতিবেদনে কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালের অর্থ লোপাটের বিষয়ে বলা হয়, করোনাকালে ওই হাসপাতালে ৯ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। ২০১৯-২০ অর্থবছরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রিজেন্ট ডিসকভারি ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলসের সঙ্গে কোনো চুক্তি ছাড়াই ২ কোটি ২৬ লাখ ৮৬ হাজার ৩০০ টাকা দেয়। রিজেন্ট ডিসকভারি ট্রাভেলস নামে প্রতিষ্ঠানটি ট্রাভেল এজেন্ট হলেও হোটেলের রুম ভাড়া ও খাবার বিল তাদের দেওয়া হয়েছে। করোনাকালে হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ছিলেন ডা. এ কে এম শামসুল আলম। হাসপাতাল প্রশাসন অডিট টিমকে বলেছে, ভয়-ভীতি দেখিয়ে আবাসিক হোটেল ও খাবার বিল পরিশোধে তাদের বাধ্য করেছে রিজেন্ট সাহেদ।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, হোটেল ব্লু বার্ডের মালিক জনপ্রতি ৩ হাজার টাকায় স্বাস্থ্যকর্মীদের রাখা ও খাবার দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। অথচ সেখানে জনপ্রতি সাড়ে ৪ হাজার টাকায় হোটেল মালিকের সঙ্গে চুক্তি করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এভাবে অতিরিক্ত বিল দেখিয়ে ৮০ লাখ ৫০ হাজার ৫০০ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।

মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল : রাজধানীর তোপখানা রোডের এশিয়া হোটেলে ভাড়া দেওয়ার মতো কক্ষ আছে ৪৫টি। প্রতিটি কক্ষের ভাড়া ২ হাজার ৯৫০ টাকা করে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি হয়। কিন্তু বিল দেওয়ার সময় কক্ষের হিসাব না করে জনপ্রতি হিসাবে একই হারে ভাড়া দেখানো হয়েছে। শুধু তাই নয়, একেক দিন সর্বনিম্ন ৪৯ থেকে ৭৮টি পর্যন্ত রুম ভাড়া দেখিয়ে বিল তোলা হয়েছে। হোটেলটিতে ২০২০ সালের ২৩ এপ্রিল থেকে ১৭ মে পর্যন্ত ১ হাজার ১২৫ স্বাস্থ্যকর্মী অবস্থান করেন। কিন্তু দেখানো হয়েছে ১ হাজার ৬৯৪। ২৫ দিনে অতিরিক্ত ৫৩৯টি কক্ষ বেশি দেখিয়ে ১৫ লাখ ৯০ হাজার ৫০ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এ বিষয়ে এশিয়া হোটেলের এক নির্বাহী ডিপজল কালবেলাকে জানান, তাদের হোটেলে মোট কক্ষ সংখ্যা ৫৪টি। এর মধ্যে ভাড়া দেওয়া হয় ৫৩টি।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল : তোপখানা রোডের নিউইয়র্ক হোটেলে কক্ষপ্রতি ২ হাজার টাকায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চুক্তি হয়। এটিতে অবস্থানকারীদের সংখ্যা বেশি দেখিয়ে ৬ লাখ ৪২ হাজার ও খাবার বিল বেশি দেখিয়ে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের স্বাস্থ্যকর্মীদের টিকাটুলীর ওসমানী ইন্টান্যাশনাল হোটেলে রাখা হয়। সেখানেও একই কায়দায় ৫ লাখ ৭৮ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।

কুয়েত মৈত্রী, কুর্মিটোলা এবং মুগদা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কোয়ারেন্টাইনের বরাদ্দ থেকে চিকিৎসা সরঞ্জামাদি ও যন্ত্রপাতি ক্রয়ের ক্ষেত্রে ১ কোটি ৩৪ লাখ ৮৭ হাজার ৭৭৫ টাকা লোপাট করেছে। সব মিলিয়ে ২৯ কোটি ৯৩ লাখ ৬৮ হাজার ৯৬৯ টাকা লোপাটের কথা বলা হয়েছে। যারা এসব অর্থ তছরুপ করেছে তাদের চিহ্নিত করে অর্থ আদায়সহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয় নিরীক্ষা প্রতিবেদনে।

করোনাকালে বিভিন্ন হাসপাতালের দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগ অনুসন্ধানে মাঠে নেমেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। রিজেন্ট হাসপাতাল কেলেঙ্কারি ও সিএমএসডির মাস্ক ক্রয়ের দুর্নীতির অনুসন্ধান শেষে মামলা করেছে দুদক। তবে মুগদা, ঢাকা মেডিকেল কলেজ এবং কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালে দুর্নীতির অভিযোগ বিষয়ে অনুসন্ধান থেমে আছে।

জানা গেছে, কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক, পরিচালকসহ অন্যদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারসহ বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুদক। এজন্য তথ্য ও রেকর্ডপত্র চেয়ে ২০২০ সালের ৯ আগস্ট দুদকের তৎকালীন পরিচালক (বর্তমানে মহাপরিচালক) মীর মো. জয়নুল আবেদীন শিবলী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছিলেন। এরপর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রেকর্ডপত্র দুদকে জমা দেয়।

এ ছাড়া মুগদা জেনারেল হাসপাতালের পরিচালকসহ অন্যদের বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ অনুসন্ধান করছেন দুদকের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ শাহজাহান মিরাজ। তিনি অভিযোগ অনুসন্ধানের স্বার্থে বিভিন্ন নথিপত্র চেয়ে ২০২০ সালের ১২ জুলাই চিঠি দেন সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল পরিচালককে। হাসপাতাল থেকে নথিপত্র পাঠানো হয়। এসব অনুসন্ধান এখনো শেষ হয়নি।

করোনাকালে হাসপাতালগুলোর অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) প্রধান নির্বাহী ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘এটা স্বাভাবিক সময়ের কোনো ঘটনা নয়। এটা সংকটকালীন সময়ের ঘটনা। এটি একদিকে যেমন অনিয়ম, অন্যদিকে অমানবিক ঘটনাও বটে। করোনাকালে অনেক প্রতিষ্ঠান ভালো কাজ করেছে। যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অনিয়ম করেছে, তাদের শাস্তির আওতায় আনা দরকার।’

তিনি আরও বলেন, ‘অডিট হচ্ছে আমাদের রাষ্ট্রীয় সংস্থা। এর রিপোর্টে যে অনিয়ম হওয়ার কথা বলা হয়েছে, তা আমলে নিতে হবে। এসব অনিয়ম একটি কাগজে রিপোর্ট হিসেবে ভাবলে হবে না। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে তাদের উচিত হবে, যারা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত তাদের চিহ্নিত করে শাস্তি নিশ্চিত করা। তা না হলে এ ধরনের অডিট রিপোর্ট হবে আর আমরা পড়তে থাকব। তারপর কিছু আলোচনা হবে, যারা দুর্নীতি করবে তারা সুরক্ষা পাবে, এটা দেশবাসী চায় না।’