অভিযোগের পাহাড় হিসাবরক্ষক নূরে আলমের বিরুদ্ধে!

Tuesday, November 29th, 2022

১৯৯৩ সালে শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চতুর্থ শ্রেণির জুনিয়র মেকানিক পদে চাকরি শুরু করেন নূরে আলম। পদোন্নতি পেয়ে তৃতীয় শ্রেণির অফিস সহায়ক কাম-কম্পিউটার অপারেটর হন। ২০১০ সালে এই পদে নারায়ণগঞ্জ সিভিল সার্জন কার্যালয়ে যোগ দেন। সেই নূরে আলম এখন নারায়ণগঞ্জ সিভিল সার্জন কার্যালয়ের হিসাবরক্ষক। চাকরিবিধি অনুযায়ী, তিনি এই পদে কোনোভাবেই পদায়িত হতে পারেন না। কিন্তু সেই অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন নূরে আলম। এজন্য চাকরি জীবনের শুরুর পদও গোপন করেন তিনি।

গত বৃহস্পতিবার কালবেলার ১১ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘ঘুষ না দেওয়ায় বকেয়া রেখেই চাকরিচ্যুত ১৮’ শিরোনামে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর বেরিয়ে আসতে শুরু করে নূরে আলমের নানা অপকর্মের ফিরিস্তি। এসব অভিযোগের প্রমাণ কালবেলার কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। হিসাবরক্ষকের চেয়ারে বসেই রামরাজত্ব শুরু করেন নূরে আলম। সিভিল সার্জন কার্যালয়ের অধীন বিভিন্ন হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অহেতুক বদলিজনিত সমস্যা সৃষ্টি করে শুরু করেন ঘুষ আদায়। ঘুষ না পেলেই বদলি, ঘুষ পেলে সেই বদলি ঠেকাতেন নিজেই।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঠিকাদারের মাধ্যমে বিভিন্ন হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অস্থায়ী ভিত্তিতে কর্মরত পুরোনো ১৮ জনকে ৮ মাসের বেতন বকেয়া রেখেই চাকরিচ্যুত করা হয়। ওই ১৮ পদে মোটা অঙ্কের টাকা ঘুষ নিয়ে নতুন ১৮ জনকে পদায়িতও করা হয় পরে। নতুন ১৮ জন গত ৭ নভেম্বর থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন। এসব নিয়োগ-বাণিজ্যে নূরে আলমের নাম উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, ১৮ জনের মধ্যে ১০ জন দিয়েছেন নূরে আলম। বাকি ৮ জন দিয়েছে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান পিমা অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেড।

নূরে আলমের বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি বাণিজ্য। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৯ সালের ২৩ অক্টোবর একটি তদন্ত করেছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। কিন্তু অর্থের বিনিময়ে তিনি সেই তদন্তও ধামাচাপা দিতে সক্ষম হন। এ ছাড়া গত বছর নারায়ণগঞ্জের তৎকালীন সিভিল সার্জনও একটি ঘটনায় তার কাছে কৈফিয়ত তলব করেন। দুটি ঘটনার চিঠিই এই প্রতিবেদকের সংরক্ষণে রয়েছে।

নূরে আলম জেলার বাইরে কোথাও গেলে বিমানে যান। অতি সম্প্রতি তাদের সিন্ডিকেটের সদস্যরা বিমানে চড়ে কক্সবাজার ভ্রমণে যান এবং সেখানে পাঁচ তারকা হোটেলে রাতযাপন করেন। সন্তানদের ব্যয়বহুল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াচ্ছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নূরে আলম কয়েকজন অংশীদার নিয়ে শরীয়তপুরের গোসাইরহাটে ‘গোসাইরহাট ডায়াগনস্টিক সেন্টার’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন, যার মূল মালিক তিনি। বিষয়টি টেলিফোনে এই প্রতিবেদককে নিশ্চিত করেছেন ডায়াগনস্টিক সেন্টার দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা আবুল কালাম ফরাজীর ছেলে নাজমুল। নাজমুল জানান, নূরে আলমসহ আরও কয়েকজন এই ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক। শুধু তাই নয়, নূরে আলম গ্রামের বাড়ি গোসাইরহাটে ৫ তলা ফাউন্ডেশন দিয়ে ৩ তলা বাড়ি নির্মাণের কাজও শেষ করেছেন।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে নূরে আলমের ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সত্য নয়। তিনি কোনো নিয়োগ বা বদলি বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত নন। অস্থায়ী ভিত্তিতে এসব পদে নিয়োগ দেওয়ার জন্য ঠিকাদার নিয়োগ দেন তারা। ঠিকাদাররাই তাদের চাহিদা অনুযায়ী লোকবল সরবরাহ করেন। তারা শুধু মেধা যাচাইয়ে একটি মৌখিক পরীক্ষা নেন। এরপর যোগত্যা অনুযায়ী বিভিন্ন পদে তাদের পদায়ন করা হয়। নতুন ১৮ জনের চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে আগামী বছরের ৩০ জুন। ওই সময় জনবল সরবরাহের জন্য নতুন ঠিকাদারও নিয়োগ হবে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে নারায়ণগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. আবুল ফজল মো. মশিউর রহমান বলেন, ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে লোকবল নিয়োগ হয়। আমরা শুধু একটা মৌখিক পরীক্ষা নিই। কে কার বোন বা ভাই, সেটা আমাদের দেখার বিষয় নয়। জনবল নিয়োগে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের ভূমিকাই মুখ্য।

জানতে চেয়ে যোগাযোগ করলে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান পিমা অ্যাসোসিয়েটসের পরিচালক বাকের হোসেন বলেন, আমাদের মৌখিকভাবে ১৮ জনকে বদলে নতুন ১৮ জন দিতে বলা হয়েছিল। পুরোনো ১৮ জনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ ছিল। তাই তাদের পরিবর্তন করে নতুন দিয়েছি। এ ক্ষেত্রে সিভিল সার্জন অফিস যেমন চেয়েছে, তেমনটাই আমরা দিয়েছি।