হাজার কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম তিতাস গ্যাসে

Thursday, December 15th, 2022

ঢাকা : তিতাস গ্যাস কোম্পানীর বিরুদ্ধে থলের বিড়াল বের করেছে অডিট অধিদপ্তর। প্রতিষ্ঠানটি প্রায় হাজার কোটি টাকা অনিয়ম করেছে বলে সরকারের অডিট অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে এসব দুর্নীতির তথ্য ওঠে এসছে।

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডে ২০১৯-২০ ও ২০২০-২১ অর্থবছরে মোট ৪৮টি অনিয়মের মাধ্যমে এই লুটপাট করা হয়।এ ঘটনায় অডিট অধিদপ্তরের নিরীক্ষিত আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে প্রমাণসহ জবাব দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ।

গত ৭ ডিসেম্বর তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে পাঠানো এক চিঠিতে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়। জ্বালানি বিভাগের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা এ তথ্য জানান। এর আগে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডে (কেজিডিসিএল) ১১০ কোটি টাকার বেশি আর্থিক অনিয়ম-দুর্নীতির ঘটনা ধরা পড়েছিল।

এ প্রসঙ্গে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান ও তিতাস গ্যাসের বোর্ডের পরিচালক নাজমুল হাসান বলেন, অনিয়ম বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হলে তিতাস জবাব দেবে।

এ বিষয়ে জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, চলতি অর্থবছরের শুরুতে তিতাস গ্যাসে ২০১৯-২০ ও ২০২০-২১ অর্থবছরের নিরীক্ষা করা হয়। নিরীক্ষা করে অডিট অধিদপ্তর। এতে অর্ধশতাধিকের বেশি আর্থিক অনিয়ম পাওয়া যায়। এর মধ্যে ৪৮টি গুরুতর আর্থিক অনিয়ম। এসব অনিয়মের মাধ্যমে ৯১০ কোটি ৯৩ লাখ ৪৫ হাজার ৪২৬ টাকার দুর্নীতি হয়েছে।

অনিয়মগুলোর মধ্যে রয়েছে, বিধি লঙ্ঘন করে বাণিজ্যিক শ্রেণির গ্রাহকদের শিল্প গ্রাহক বিবেচনা করে কম মূল্যে গ্যাস বিক্রি করায় ক্ষতি হয়েছে ১৪৩ কোটি ২৩ লাখ ৪ হাজার ১৫৮ টাকা। তিতাসের এক শ্রেণির কর্মকর্তা, কর্মচারী ও ঠিকাদারদের যোগসাজশে গ্যাস বিল কম করার মাধ্যমে নিজেরা লাভবান হয়েছেন। আবাসিক গ্রাহকদের সংযোগ দেওয়ার পর গ্যাস বিল আদায় না করার কারণে তিতাস গ্যাসের ১৩ কোটি ৬৬ লাখ ৭২ হাজার ৯৯৮ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণির গ্রাহকদের কাছে থেকে সারচার্জ আদায়ের কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় ৩০ লাখ ৫৭ হাজার ৮৫ টাকা এখনো অনাদায়ী।

সিএনজি গ্রাহকদের কাছে বছরের পর বছর গ্যাস বিল বকেয়া থাকলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ। এমনকি বকেয়া থাকা গ্রাহকদের সংযোগও বিচ্ছিন্ন করা হয়নি। এর ফলে দুই অর্থবছরের বকেয়ার পরিমাণ দাঁড়ায় ৭ কোটি ৬৪ লাখ ৬১ হাজার ৫৮৬ টাকা। এ ছাড়া শিল্প কারখানায় মিটারে অবৈধ হস্তক্ষেপ প্রমাণিত হওয়ার পর জরিমানা করা হয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে।

জরিমানা বাবদ ১০ কোটি ৪২ লাখ ৭০ হাজার ৯০১ টাকা পরিশোধ না করলেও সেসব প্রতিষ্ঠানের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়নি। ফলে জরিমানার টাকাও আদায় করা সম্ভব হয়নি। একই সঙ্গে ইভিসি মিটারের সংশোধনযোগ্য বিল প্রণয়ন ও আদায় না করায় তিতাসের ক্ষতি হয়েছে ১৬ লাখ ৬২ হাজার ৯৬৮ টাকা। বকেয়া পরিশোধের শর্তে পুনঃসংযোগ দিলেও পরবর্তী সময়ে বকেয়া আদায় না করা এবং সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করায় ২ কোটি ৪ লাখ ৪১ হাজার ৯৬৮ টাকা ক্ষতি হয়েছে।

এ ছাড়া গ্রাহকের গ্যাস বিলে নেগেটিভ অ্যাডজাস্টমেন্টের কারণে ক্ষতি হয়েছে ১৩ কোটি ৮২ লাখ ৬৯ হাজার ৫২৬ টাকা। স্থায়ীভাবে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পরও আইন না মেনে ৭ বার পুনঃসংযোগ দেওয়ার কারণে ক্ষতি ১০ কোটি ৩২ লাখ ৭০ হাজার ২০৭ টাকা।

এক শিল্প গ্রাহকের বিষয়ে তদন্ত কমিটির সঠিক রিপোর্টকে ভুল রিপোর্ট বানিয়ে প্রতিবেদনে দাখিল করার মাধ্যমে ২ কোটি ৯৫ লাখ ৩৯ হাজার ৪৩৮ টাকার দুর্নীতি করা হয়েছে। এ ছাড়া কিছু বাণিজ্যিক গ্রাহকের ক্ষেত্রে আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করার কারণে ওইসব গ্রাহক থেকে ৪৫ কোটি ২১ লাখ ৯৫ হাজার ২১৩ টাকা আদায় করা যায়নি। এসব টাকা আদায় নিয়েও সন্দেহ রয়েছে।

গ্যাস বিপণন নিয়মাবলি ও বোর্ড সভার সিদ্ধান্ত লঙ্ঘন করলেও গ্রাহকের প্রতি আনুকূল্য প্রদর্শন করে যথাসময়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ব্যবস্থা না নেওয়ায় গ্রাহকের কাছ থেকে বকেয়া বাবদ ১০০ কোটি ৯ লাখ ৯০ হাজার ৪১২ টাকা এখনো আদায় করা যায়নি।

জানা গেছে, এসব গ্রাহক সবই বাণিজ্যিক ও শিল্প গ্রাহক। গ্রাহকের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে বোর্ডের সিদ্ধান্ত না মানার কারণে ৯ কোটি ৬৩ লাখ ৯২ হাজার ৯২৪ টাকা আদায় করা যায়নি। এ ছাড়া সুপ্রিম কোর্টের আদেশ অনুযায়ী বকেয়া বিল পরিশোধ না করা সত্ত্বেও সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করায় ১৪ কোটি ৪২ লাখ ৩৮ হাজার ৩৩৯ টাকা এবং বোর্ড সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বকেয়া গ্রাহকদের ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় তিতাসের ক্ষতি হয়েছে ৫ কোটি ২০ লাখ ১১ হাজার ৭০৩ টাকা।

মন্ত্রণালয়ের আদেশ উপেক্ষা করে ১৪৭টি নতুন আবাসিক ও ২টি বাণিজ্যিক সংযোগ দেওয়া হয়েছে আলোচ্য দুই অর্থবছরে। নিরীক্ষায় স্থায়ী বিচ্ছিন্নযোগ্য গ্রাহককে স্থায়ীভাবে বিচ্ছিন্ন না করে ফের সংযোগ দেওয়া হলেও বকেয়া আদায় না করায় ১ কোটি ৮৬ লাখ ৭১ হাজার ১১৩ টাকা ক্ষতি হয়েছে।

তিতাসের ভান্ডার অব্যবস্থাপনার কারণে ব্যবহারযোগ্য টেপ নষ্ট হওয়ায় কোম্পানির ৬৬ লাখ ৩৫ হাজার ৭০৬ টাকা, বিভিন্ন পণ্যে গুণগত মান যাচাই না করায় ক্ষতি ৩ কোটি ৬৭ লাখ টাকা, গ্রাহকের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে বোর্ডের সিদ্ধান্ত না মানায় ১৯ কোটি ৮ লাখ ২ হাজার ৭২৫ টাকা, মিটার রিডিং অনুযায়ী প্রকৃত বিল না করে কম রিডিং করে বিল করায় ১ কোটি ৬৭ লাখ ২৯ হাজার ৬৪৯ টাকা, অনুমোদিত চাপের অতিরিক্ত চাপে গ্যাস সরবরাহ করায় ১২ লাখ ৭ হাজার ১৯৩ টাকা, সাধারণ শিল্পে অনুমোদিত স্থাপনায় গ্যাস ব্যবহার না করলেও সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করায় এক গ্রাহকের কাছে বকেয়া ৯ কোটি ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৩১২ টাকা এখনো আদায় করা যায়নি।

গ্যাস বিক্রির ক্ষেত্রে কর পরবর্তী সময়ে মুনাফার পরিবর্তে কর পূর্ব মুনাফার ভিত্তিতে শ্রমিকের অংশগ্রহণমূলক লভ্যাংশ তহবিলে অর্থ স্থানান্তরে করযোগ্য আয় কম প্রর্দশনের কারণে করপোরেট ট্যাক্স বাবদ সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে ১ কোটি ১৯ লাখ ৭৩ হাজার ৩০৬ টাকা, ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকে স্থায়ী আমানত হিসেবে অর্থ বিনিয়োগ এবং মেয়াদপূর্তিতে তা নগদায়নে ব্যর্থ হওয়ার পরেও ফের একই ব্যাংকে বিনিয়োগ করায় তিতাসের ৫৩ কোটি টাকা আদায়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া গ্রাহকের অবৈধ হস্তক্ষেপের পরিপ্রেক্ষিতে গঠিত তদন্ত কমিটির সুপারিশ ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সিদ্ধান্ত না মানায় জরিমানা ও অতিরিক্ত বিল বাবদ আদায়যোগ্য ৭ কোটি ৯ লাখ ৬৭ হাজার ৭০৫ টাকা আদায় করা যায়নি।

তিতাস গ্যাস ত্রুটিপূর্ণ চুক্তির কারণে প্রতিষ্ঠানের আউটসোর্সিং কর্মচারীদের প্রাপ্যতার চাইতে অধিকাল ভাতা, উৎসব বোনাস ও নববর্ষ ভাতা প্রদান করায় সংস্থার ক্ষতি হয়েছে ২ কোটি ৩৪ লাখ ৬০ হাজার ৩৮২ টাকা। পিপিআর-২০০৮ লঙ্ঘন করে একমাত্র দরদাতা থেকে পণ্য ক্রয় করায় ক্ষতি ১৪ লাখ ৭ হাজার ৩১৬ টাকা, ৩ হাজার লিটার সিনথেটিকের হদিস না পাওয়ায় ৭ লাখ ৭৬ হাজার ১৬০ টাকা, একমাত্র দরদাতা দরপত্রে অংশগ্রহণ করলেও পুনঃদরপত্র আহ্বান না করে প্রাক্কলিত মূল্য অপেক্ষা অস্বাভাবিক উচ্চদরে চুক্তি করার মাধ্যমে ৯২ লাখ ৫৮ হাজার ৩১৯ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।

তিতাসের ব্যবহার অযোগ্য পাইপ ব্যবহারযোগ্য ঘোষণা করে প্রকল্পে ব্যবহারের কারণে প্রকল্প বাতিল হয়। এ অবস্থায় পাইপের মূল্য, রাস্তা কাটার খরচ ও প্রকল্প ব্যয় বাবদ ৭ কোটি ৯৩ লাখ ১৪ হাজার ৯৮০ টাকার অনিয়ম হয়েছে। জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ উপেক্ষা করে কর্মচারীদের স্পেশাল ইনক্রিমেন্ট দেওয়ার কারণে ২৫ লাখ ৩৯ হাজার ১২৪ টাকা, যথাসময়ে লাইসেন্স নবায়ন না করায় ১০ টাকা ক্ষতি হয়েছে।

গ্যাস বিপণন নীতিমালা অনুযায়ী শিল্প জেনারেটর ও সিএনজি শ্রেণির গ্রাহকদের ভারসাম্য জামানত হালনাগাদ না করায় অনিয়ম হয়েছে ৩৯৬ কোটি ৪৫ লাখ ৪৬ হাজার টাকা। চালু মিটারযুক্ত গ্রাহকদের গ্যাস বিল দীর্ঘদিন বকেয়া থাকা সত্ত্বেও সংযোগবিচ্ছিন্ন না করায় এখনো অনাদায়ী রয়েছে ৩০৮ কোটি ৩২ লাখ ৭৫ হাজার ১৬৫ টাকা।

আবাসিকে মিটারবিহীন গ্রাহকদের কাছ থেকে যথা সময়ে বকেয়া আদায়ের কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় ১৮ কোটি ১৪ লাখ ৪৫ হাজার ৩৬৩ টাকা। ভুল প্রত্যয়নপত্র প্রদানের মাধ্যমে বকেয়া টাকা আদায় না করে পুনঃসংযোগ দেওয়ায় ৪৬ লাখ ৫৭ হাজার ১১৪ টাকা, পেট্রোবাংলার নির্দেশনা উপক্ষো করে রিভিউ কমিটির ধার্যকৃত জরিমানা বাবদ ৭৫ কোটি ৭৯ লাখ ২১ হাজার ৭৭ টাকা আদায় করা হয়নি।

পাশাপাশি আইন না মেনে ব্যবস্থাপনা পরিচালক কর্তৃক গ্রাহককে কিস্তি সুবিধা দেওয়ায় ১ কোটি ৮ লাখ ২৮ হাজার ২৯০ টাকার দুর্নীতি হয়েছে। একই সঙ্গে বোর্ডসভার সিদ্ধান্ত ও মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা না মেনে কয়েকটি শিল্প গ্রাহকের সংযোগবিচ্ছিন্ন না করে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে গ্যাস ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার কারণে ৪ কোটি ৫ লাখ ৯৮ হাজার ৩১৪ টাকা এবং ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের কাছ থেকে আয়কর কর্তন না করায় রাজস্ব বাবদ ৭ লাখ ৩৮ হাজার ৫০২ টাকার অনিয়ম হয়েছে।